মুসলমানের বাচ্চা? বিসমিল্লা’ পারি তো?

মসজিদে নববী’র ইমাম বললেন, “ওয়াও!! …ওয়াও কোত্থেকে এলো!?”

Gulf-এ থাকার সুবাদে আব্বা, মাশা’আল্লাহ, হজ্জ্ব করেছেন, আর একাধিকবার তাঁর ওমরা’ করারও অভিজ্ঞতা আছে। তো একবার ওমরা করতে গিয়ে আসরের নামাজের পরে দেখতে পেলেন মদিনা’র মসজিদে নববী-তে ক্বোরআনের দর্‌স বসেছে। স্বয়ং মসজিদ-এ-নববী’র ইমাম সাহেব ক্বোরআন শিক্ষা দিবেন। আব্বা, সুযোগ হেলায় হারালেন না। বসে পড়লেন। একে একে তাঁর সুযোগ যখন এলো, উনি বেশ গর্বের সাথেই তিলাওয়াত শুরু করলেন…

গর্বের সাথে কেন?

কারণ, মাদরাসা-ছাত্র না হয়েও আমাদের, সিলেটিদের বেশিরভাগই দেওবন্দ মাদরাসা’র ওস্তাদদের সাহচর্য পেয়েছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। অধিকাংশ ওস্তাদই হয় স্বয়ং দেওবন্দ-ফারেগ (মানে দেওবন্দ মাদরাসা থেকে পাশ করা) কিংবা তাঁদের ওস্তাদ দেওবন্দ-ফারেগ ছিলেন। সুতরাং আল্লাহ’র দয়ায় আমাদের তিলাওয়াত বেশ শুদ্ধই দেখা যায়। গর্বতো আর কেউ ধরিয়ে দেয় না, গর্ব পেটের ভিতরে আপনা-আপনি তৈরি হয়, তারপর সেটা আহ্লাদ পেয়ে পেয়ে মাথায় চড়ে।

আব্বা বেশ সুললিত কণ্ঠে শুরু করলেন, “আঊযুবিল্লা-হি মিনাশ শাইতোয়ানির্‌রোয়াজীম… বিসমিল্লাহির রোয়াহ্বমা-নির…”

“ওয়াও!!!” আব্বাকে মাঝপথে থামিয়ে ইমাম সাহেব আশ্চর্য হয়ে আরবিতে জিজ্ঞেস করলেন, “ওয়াও কোত্থেকে এলো?!”

আব্বা তো আশ্চর্য! তিনি ‘ওয়াও’ (আরবি হরফ ﻮ) কোথায় বললেন?

এরপর ইমাম সাহেব যা বললেন, তার সারমর্ম হচ্ছে, আব্বা, বিসমিল্লা’ পড়ার সময় “রোয়াহ্বমা..” বলছেন, এখানে আরবিতে র-হ্বা-মিম-হামযা-নুন (رحمان) আছে, মাঝখানে কোনো ‘ওয়াও’ নেই, তাই এটা উচ্চারণের ভুল। এরপর সঠিকটা তিনি উচ্চারণ করে শুনিয়ে দিলেন।

আব্বার গর্ব ধুলায় মিশে গেল।

তিনি দেশে এসে আমাকে আক্ষেপ করে বললেন, জানো, আমরা এখনও বিসমিল্লাও ঠিকমতো শিখি নাই। 🙁 তাঁর কণ্ঠে চরম হতাশা।

কিন্তু সঠিকটা কী, তাঁকে সেটা ইমাম সাহেব বলে বুঝিয়ে দেয়াসত্ত্বেয় তিনি ধরতে পারেননি।

 

এবারে টেনশনে পড়ে গেলাম আমি। মহা মসিবতের কথা! সারাজীবন যা শিখলাম, এবার শুনি সেটা ভুল!

বইপত্র ঘাঁটা শুরু করলাম। যে বইই পড়িনা কেন, সবখান থেকেই একটা ব্যাপার নিশ্চিত: রা (ﺮ)-এর উপর যবর (ﹶﺮ) থাকলে সেখানে রা-কে পূর/মোটা করে উচ্চারণ করতে হয়। অর্থাৎ, রাহ্বীম না বরং রোয়াহ্বীম। কিন্তু পূর করতে গেলেই তো ‘ওয়াও’-টা মাঝখানে চলে আসছে… সমাধান কী? পূরও করতে হবে, আবার ‘ওয়াও’-ও আসা চলবে না।

স্থানীয় ইমামের সাথে কথা বললাম, তিনি উচ্চারণ করলেন, উচ্চারণ শুদ্ধ, কিন্তু না, ধরতে পারলাম না সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাই যদি ধরতে না পারি, তাহলে সমাধান কিভাবে করবো?

 

অবশেষে, হঠাৎই একদিন সমাধানটা খুঁজে পেলাম শুদ্ধ বাংলা ভাষায়

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, আরবি ভাষার একটা উচ্চারণগত সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলাম বাংলা ভাষায়।

যারা শুদ্ধ ভাষার মতো করে ও-কারের উচ্চারণ করতে পারেন, কেবল তারাই সঠিক উচ্চারণটি করতে পারবেন। আমরা সিলেটিরা সাধারণত বাংলা ও-কারের উচ্চারণটা সহজ করে উ-কারের মতো করে সেরে ফেলি। যেমন: ‘দোকান’-কে সিলেটিরা উচ্চারণ করি ‘দুকান’। অথচ, ও-কারের উচ্চারণটা করতে হয় ঠোঁট গোল করে বাতাসটা ছেড়ে দিয়ে। তাই যারা গ্রাম্য টানে উচ্চারণ করেন, এই উচ্চারণটা রপ্ত করতে তাদের একটু কসরত করতেই হবে।

তো কী সেটা?

উচ্চারণ করতে হবে: রোহ্বমা-নির রোহ্বীম (الرحمن الرحيم)।

এতে রা’র উপরে যবর থাকলে তা পূর করে উচ্চারণও হয়, আবার ‘ওয়াও’-ও আসে না।

লক্ষ করুন, রোয়াহ্ব… না বলে রোহ্ব… (رح) পড়ছি।

 

আমার যে বিষয়টা চিন্তা করে আশ্চর্য লাগে সেটা হলো খলিফা ওসমানের [আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট থাকুন] খিলাফতকালীন ক্বোরআন সংকলনের সময় কী যত্ন সহকারে সঠিক উচ্চারণের প্রেক্ষিতে ক্বোরআনকে সংকলন করা জরুরি ছিল, কারণ শ্রেফ একটা উচ্চারণের ভুলের কারণে মাঝখানে একটা হরফ ঢুকে যেতে পারতো…

-মঈনুল ইসলাম

nanodesigns

মন্তব্য করুন