বাংলাদেশ রেলওয়ে: ভ্রমণে স্বাগতম (কিস্তি ২)

ধারাবাহিক:  বাংলাদেশ রেলওয়ে: ভ্রমণে স্বাগতম —এর একটি পর্ব

« আগের পর্ব

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলো চলে এখনও অতীতাশ্রয়ে পুরোন পদ্ধতিগুলোই ব্যবহার করে অল্প-বিস্তর আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন করে বাংলাদেশ রেলওয়ে চলে। স্টেশনগুলোতে কম্পিউটার মনিটরে নিকটবর্তি রেললাইনগুলোতে ট্রেনের চলাচলের অবস্থা ট্র্যাক করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তবে এটা সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র নয়। অনেক স্টেশনেই এখনও সেই ব্রিটিশ আমলের সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয় যোগাযোগের প্রয়োজনে। ছোটবেলায় সিলেটের স্থানীয় প্রসৃদ্ধ ট্রেন “লাতুর ট্রেন”-এ নানাবাড়ি যেতাম। তখন স্টেশন মাস্টারকে দেখতাম দেয়ালে ঝোলানো একটা বিশাল বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে ডানদিকে ঝোলানো রিসিভারটা তুলতেন, তারপর বাম দিকের একটা হাতল ধরে মেশিন চালু করার মতো বেদম ঘুরিয়ে চাবি দিতেন- এরকম প্রাচীন ফোন দিয়ে যোগাযোগ করতেন অন্য স্টেশনে। টিভিতে দেখেছি আজও অনেক প্রত্যন্ত স্টেশনে এই পদ্ধতি প্রচলিত। মোবাইল ফোনের ব্যবহার রেলওয়েতে খুব কম। স্টেশন এবং গেটঘর বা লেভেল ক্রসিংগুলোতে যোগাযোগ হয় ওয়াকি-টকি দিয়ে।

খুব ছোটবেলায় কুলাউড়া জংশনে একটা কয়লার ইঞ্জিন দেখেছিলাম, বোধহয় তখনই কয়লাচালিত ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন টানার ইতি ঘটে, আমার সৌভাগ্য, সেই অতীত আমার অক্ষিপটে আটকে আছে। এখন ট্রেনের ইঞ্জিন চলে তেল দিয়ে। কোনো এক বিচিত্র কারণে ট্রেনের ইঞ্জিন ও বগিগুলো হয় খুব বেশি ভারি। সাধারণত আমরা জানি, যত কম ওজন, তত কম জ্বালানী খরচ। কিন্তু অত্যন্ত ভারি এই বাহন যে প্রচুর তেল খরচ করে, তা বলাই বাহুল্য। তবে এখানে সাধারণ গাড়ির সাথে ট্রেনের একটা সামান্য পার্থক্য আছে: ট্রেন চলে অত্যন্ত সমতল একজোড়া রেললাইনের উপর দিয়ে। ফলে গতিপ্রাপ্ত হবার পর মোমেন্টাম বা আপন-গতিই তাকে অনবরত ঠেলতে থাকে, তাই তেমন একটা জ্বালানী পোড়ে না। এই মোমেন্টামের কারণেই ট্রেনকে থামতে বেশ বেগ পেতে হয়, হঠাৎ করেই ইচ্ছে করলে ট্রেন থামতে পারে না, হঠাৎ হার্ডব্রেক কষলে বেশ অনেকদূর ছেঁচড়ে গিয়ে তারপর থামে ট্রেন। তাই ট্রেনের গতি হয় অনেকটাই অপ্রতিরোধ্য। ভাগ্যিস, ট্রেনের ইঞ্জিনটা হয় নিরেট লোহার একটা ভারি জগদ্দল বস্তু, নাহলে ঢাকায় যেবার বাসের সাথে সংঘর্ষ হয়েছিল, নিশ্চিত ট্রেনের অনেক লোক মারা পড়তো।

বাংলাদেশে ট্রেন চলে আদিযুগের পদ্ধতিতে। ট্রেন সাধারণত ইঞ্জিনই টেনে নেয়, এবং ইঞ্জিনে বসে চালক ট্রেনে গতি আরোপ করেন। কিন্তু চালক চাইলেই ট্রেন চালাতে পারেন না, তাঁকে নির্ভর করতে হয় ট্রেনের একেবারে পিছনের বগিতে থাকা ট্রেন পরিচালকের নির্দেশের উপর। তো, সেই নির্দেশ কিভাবে আসে? ভাবছেন, নিশ্চয়ই মোবাইল ফোনে। …না। তাহলে ওয়াকিটকিতে তো অবশ্যই। …না। সেই নির্দেশ আসে সবুজ পতাকা দিয়ে! আপনি কি ভাবতে পারেন, পরিচালক একদম পিছনের বগি থেকে বাইরের দিকে একখানা হাত বের করে সবুজ একখানা পতাকা নাড়েন, আর তখন সবচেয়ে সামনে থাকা চালক তা দেখে হুইসেল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দেন? এমনও অনেক সময় হতে দেখেছি যে, পরিচালক পতাকা নাড়তে নাড়তে কিঞ্চিৎ বিরক্ত, ওদিকে চালক দেখছেনই না পতাকার নির্দেশনা। …রাতের বেলায় বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালকরা ব্যবহার করেন বিশেষ একপ্রকারের ব্রিটিশ আমলের ল্যানটার্ন, যাতে সবুজ এবং লাল আলো ফুটিয়ে তোলা যায়, অন্ধকারে যা নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। আবার কখনও টর্চ লাইটের মাথায় লাল-সবুজ কাপড় লাগিয়েও কাজটি করা হয়। ইদানিং আর লাল-সবুজ নেই, সরাসরি টর্চ জ্বেলেই নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে নির্দেশনা যখন ব্যর্থ হয়, তখন চালকের মোবাইল ফোনে মিস্‌ড কল দিয়ে তাকে নির্দেশনা সম্পর্কে সজাগ করে দেয়া হয়।

পরিচালক আবার অন্য আরেকটা নির্দেশনার অপেক্ষা করে থাকেন, তা হলো স্টেশন মাস্টারের সিগন্যাল। নিকটবর্তি স্টেশন মাস্টার কম্পিউটার নিয়ন্ত্রীত ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে হোক, কিংবা ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে হোক পার্শ্ববর্তি রেললাইনের অবস্থা পর্যালোচনা করে, সময়সূচি বিবেচনা করে ভিতর থেকে ট্রেনের সিগন্যাল বাতিগুলো পরিচালনা করেন। এই সিগন্যাল বাতির ব্যাপারটা বুঝতে শিখেছি এই কিছুদিন হলো: লাল বাতি হলো “অনুমতি নেই”। কিন্তু হলুদ বাতি হলো “অনুমতি দিলাম, কিন্তু নির্দেশের প্রয়োজন”। সবুজ বাতি দিয়ে নির্দেশ করা হয় “চলতে থাকো, থেমো না, কোনো নির্দেশের দরকার নেই”। রেলওয়ের সিগন্যালিং-এও রাজপথের মতো লাল-হলুদ-সবুজ তিনরঙা বাতির সিগন্যাল পোস্ট থাকে। লাল থেকে যেই হলুদ বাতি হয়, তখন আসে ট্রেন পরিচালকের দায়িত্ব। তিনি তখন সিদ্ধান্ত দেন, ট্রেন চলবে কিনা থেমে থাকবে। হলুদ বাতি থাকাসত্ত্বেয় ট্রেনের পরিচালকের নির্দেশ না পেলে চালক কোনোভাবেই ট্রেন চালু করতে পারেন না। আধুনিক বৈদ্যুতিক সিগন্যাল বাতির আগে ছিল তার টেনে সিগন্যাল দেয়া, সেক্ষেত্রে লম্বাটে এক প্রকারের দন্ডওয়ালা সিগনাল-মাথা দিয়ে সিগন্যাল দেয়া হতো। বাতির বদলে সেখানে থাকতো লাল-হলুদ-সবুজ স্বচ্ছ প্লাস্টিক, পিছনের সূর্যের আলোর কারণে মনে হতো কোনো একটা নির্দিষ্ট বাতি জ্বলছে, কারণ বাকি বাতিগুলোর পিছনটা তখন নিরেট লোহার আবরণের কারণে কালো দেখাতো। এভাবে সিগন্যাল দেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ সিগন্যাল চিনতো, ঐ লম্বা দন্ডটা নিচের দিকে থাকলে, “গ্রিন সিগন্যাল”, উপরের দিকে তোলা থাকলে “লাল বাতি” হিসেবে।

রেলওয়ের নিরাপত্তা: বাংলাদেশের রেলওয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আছে বাংলাদেশ আনসার বাহিনী। গেরুয়া রঙের পোষাকে তাঁরা প্রাচীন আমলের কাঠের বাটযুক্ত থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ঝুলিয়ে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন। কিছু সংখ্যক আনসারই কেবল ভারি অস্ত্র রাখতে পারেন, তবে সাধারণত তাঁদের দেখা যায় না। বিশেষ নিরাপত্তা-মুহূর্তে তাঁরা যখন হেলমেট এবং ভেস্ট পরে থাকেন, তখন দেখে মনে হয় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কেউ বুঝি। আনসার ছাড়াও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে তাদের সহায়তা করে রেলওয়ে পুলিশ এবং র‍্যাব। আনসার ও পুলিশ যেখানে সাধারণ নিরাপত্তা ইস্যুগুলো দেখে, সেখানে র‍্যাব জঙ্গীবাদ এবং অন্যান্য ড্রাগচক্রের ইস্যুগুলো দেখে, কখনও যাত্রী তল্লাশি এবং ব্যাগ তল্লাশিও করে। এই ঘটনা সাধারণত আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে দেখা যায়। রেলপথে ডাকাতের আক্রমণ হলে আনসার ও পুলিশ মিলিতভাবে তা প্রতিহত করেন, এবং আমার এক মামাতো ভাইই তাঁর এমন এক সফল অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন আমার কাছে। এসব থাকাসত্ত্বেয় ভারত, বাংলাদেশের সাথে রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠালগ্নে ঢাকা-কলকাতা র‍্যুটের উভয় পাশে কাটাতারের বেড়ার জন্য দাবি জানিয়েছিল। আমার দরিদ্র দেশের কাছে বড় বেশি চাওয়া তার!

ঢাকা-ঢাকা রেল যোগাযোগ: এবারে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে বলি: ঢাকার রাজপথে জ্যামে আটকা পড়ে যেসকল অফিসযাত্রী তীব্র রোষানলে পোড়েন, তাদের জন্য কিছুটা সুখবর নিয়ে আছে রেলওয়ের বিশেষ ট্রেন সুবিধা। কিন্তু কী এক বিচিত্র কারণে রেলওয়ে, এর প্রচার করে না। যারা জানেন, তারাই আরেকজনকে খবরটা দেন। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা, যেখানে আপনার ২ থেকে আড়াই ঘন্টা লাগার কথা জ্যামে পড়ে বাসে বসে যেতে, সেখানে আপনি প্রায় আধা ঘন্টা-৪৫ মিনিটে পৌঁছে যাবেন, ইনশাল্লাহ।

টঙ্গী-জয়দেবপুর থেকে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত একটা ট্রেন (নাম: তুরাগ) প্রতিদিন কয়েকবার যাতায়াত করে (আমি অন্তত দুবারের কথা সঠিক করে জানি: সকাল সাড়ে সাতটার দিকে টঙ্গী থেকে, এবং বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে কমলাপুর থেকে)। বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এর টিকেটের মূল্য মাত্র ৬টাকা। টিকেটটা দেখতে অনেকটা প্লাটফর্ম টিকেটের মতো, তবে হলুদ রঙের না হয়ে হয় খানিকটা লালচে ছাই রঙের। …এটি একটি সাধারণ ট্রেন।

এছাড়াও আছে সব মেইল ট্রেন, সাধারণ ট্রেন এবং আন্তঃনগর ট্রেন। তবে সাধারণ ট্রেনের মধ্যে তিস্তা এবং তিতাস কমিউটার-এর ভাড়া বিমানবন্দর থেকে ১৫টাকা, কিন্তু সব আন্তঃনগরের ভাড়া বিমানবন্দর থেকে ৩০টাকা। আমি বারবার বিমানবন্দর স্টেশনের উল্লেখ করছি, কারণ আমি ওখান থেকে নিয়মিত অফিসে ট্রেন দিয়ে যাওয়া-আসা করি। ছোটবেলার সঙ্গী সেই ট্রেন এখন আবার অফিস পর্যন্ত গড়াবে –এটা ভাবিনি কখনও।

ট্রেনে কখনও ঝুলে থাকি, তবু যে সেটা কতটা আনন্দের, এই ছবিতে তা বুঝতে পারবেন (ছবি: লেখক)
ট্রেনে কখনও ঝুলে থাকি, তবু যে সেটা কতটা আনন্দের, এই ছবিতে তা বুঝতে পারবেন (ছবি: লেখক)

ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করার ক্ষেত্রে প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট করাটা সত্যিই অনেক ঝক্কির। সেজন্য একটা সহজ অর্থ-সাশ্রয়ী পথও আছে: মাসিক টিকেট। এই টিকেটের সুবিধা হলো, মাত্র একটা টিকেট দিয়ে আপনি ঢাকা-জয়দেবপুর, এক মাসে যতবার ইচ্ছা ভ্রমণ করতে পারেন। মাসিক টিকেট আছে দুধরণের: (ক) সাধারণ টিকেট (৳৩০০); (খ) প্রথম শ্রেণীর টিকেট (৳১,০০০)। তবে এই নামে এগুলোকে কেউ ডাকে না, এগুলোকে সবাই এর টাকার পরিমাণ দিয়ে ডাকে: তিনশ’ টাকার টিকেট, একা’জার টাকার টিকেট। তিনশ’ টাকার টিকেট দিয়ে চড়া যাবে যেকোনো সাধারণ অথবা মেইল ট্রেনে, একমাসে, যতবার ইচ্ছা, ঢাকা-জয়দেবপুর –আন্তঃনগর ট্রেনে চড়ার নিয়ম নেই। একহাজার টাকার টিকেটে চড়া যাবে যেকোনো ট্রেনে, একমাসে, যতবার ইচ্ছা, ঢাকা-জয়দেবপুর। তবে অনেকেই তিনশ’ টাকার টিকেট দিয়ে আন্তঃনগর ট্রেনে চড়েন, তবে “শোভন” কামরায় না উঠে, অন্য কামরা, বিশেষ করে “প্রথম শ্রেণী”র কামরায় উঠলে টিকেট চেকাররা/এ্যাটেনডেন্টরা বেশ অভদ্র আচরণ করেন, এমন একটা ব্যবহার করেন, মিয়া ফকির, ট্যাকা নাই, আবার ফাসক্লাসে বইসা যাস! মুখে বলেন না, তবে ব্যবহারটা সেরকমই ইঙ্গিত করে। এর একটা বিশেষ কারণ আছে:

কারণ হলো, যারা টিকেট ছাড়া ঢাকা-জয়দেবপুর ভ্রমণ করেন, তাদের কাছ থেকে কিছু টাকা কামানোর সুযোগ হয় এসব টিকেট চেকারদের। জনপ্রতি ৳১০[টাকা] করে নিয়ে পার করে দেন টিকেট চেকাররা। তবে সেখানে কে যে সত্যিকারের টিটি, আর কে যে কালো কোটধারী স্টাফ, সেটা বোঝা ভার। এই টাকায় নাকি ভাগ থাকে ট্রেনের আনসারদেরও। এখন যারা মাসিক টিকেট করে চলাচল করেন, তারা এই টাকা দেননা, বরং কখনও কখনও প্রতিবাদও করেন, তাই এদের উপর টিটিরা কিছুটা ক্ষেপা। সুযোগ পেলে তাই অপমান করতে ছাড়ে না তারা। …উল্লেখ্য, এভাবে দশ টাকা দিয়ে ট্রেনের ভিতরে পার পেলেও স্টেশনে যদি টিকেট চেক হয়, তখন কিন্তু আপনি পার পাবেন না, কারণ এরা আপনার থেকে দশ টাকা খেয়ে কোনো টিকেট আপনার হাতে দিবে না। আর গেটে যারা ধরবে, তারা দশ টাকায় মানবে না। তারা হয় ত্রিশ টাকা খাবে (যেখানে আনসারের ভাগও থাকবে), নয়তো আনসারগুলো আপনার হাতে হাতকড়া পরিয়ে জনসমক্ষে অপদস্ত করবে, কিংবা উচ্চস্বরে টিকিট চেয়ে জনআকর্ষণ সৃষ্টি করে আপনার অপরাধীর চেহারা সবাইকে দেখিয়ে মজা লুটবে। তাই নিয়মিত যাত্রীদের মাসিক টিকেট একটা বড় সহায় (নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বাপেক্ষা বড় সহায়)।

মাসিক টিকেটের আদ্যোপান্ত: মাসিক টিকেট করতে হয় কমলাপুর স্টেশন থেকে। সেজন্য আপনার দরকার (ক) একখানা দরখাস্ত, (খ) দু’কপি ছবি (পাসপোর্ট হওয়া উত্তম), (গ) ৩১০/১০১০ টাকা (যেখানে ১০টাকা হলো নিবন্ধন ফি, যা শুধু প্রথমবারই দিতে হয়)। (আপনাদের সুবিধার জন্য একখানা দরখাস্ত এখানে^ দিলাম, বিনামূল্যে নামিয়ে ব্যবহার করুন, উন্মুক্ত!)

রেলওয়ের ৩০০ টাকার মাসিক টিকেটের উভয় পিঠ
রেলওয়ের ৩০০ টাকার মাসিক টিকেটের উভয় পিঠ

দরখাস্তের বক্তব্য হয় এরকম–  বরাবর স্টেশন মাস্টার | বিষয়: মাসিক টিকেটের আবেদন | …আমি ঢাকা-অমুক র‍্যুটে নিয়মিত যাতায়াত করি… তো আমাকে একখানা মাসিক টিকেট দিয়ে দিলে আপনি বেহেস্তে চলে যাবেন…। দরখাস্তখানা নিয়ে যেতে হয় প্লাটফর্ম টিকেট দেয়ার যে কাউন্টারটা আছে কমলাপুর স্টেশনে, সেই কাউন্টারটার ঠিক পিছনের ঘরটাতে। ওখানে যেতে হয় পত্রিকার দোকানের পিছন দিয়ে একটা গলি আছে, ওখান দিয়ে। মাসিক টিকেটের কথা বললে যে-কাউকে জিজ্ঞাসা করলে পথ বাতলে দিবে। ঐ কক্ষে বসেন যিনি, তিনি খুব যে সদালাপি, তা না, অনেক ক্ষেত্রে আপনাকে উপেক্ষা করতে পারেন, তবে যদি মুড ভালো থাকে, তিনি আপনার প্রশ্নের উত্তর খুব সুন্দর করে দিবেন।

মাসিক টিকেটের হিসাব হয় প্রতিমাসের ৫ তারিখ থেকে পরবর্তি মাসের ৪ তারিখ পর্যন্ত। তবে মাসের ৪ তারিখের মধ্যেই টিকেট রিনিউ করা সব সময় সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে মাসের যেকোনো দিনই সেটা হয়ে থাকে, নিয়ম এখানে তেমন মানা হয় না। তবে, সমস্যা হলো মেয়াদোত্তীর্ণ মাসিক টিকেট নিয়ে আপনি ট্রেনে কিংবা স্টেশনের গেটে ধরা পড়তে পারেন। তাই যখনই সুযোগ হয়, টিকেট রিনিউ করিয়ে নেয়াই উত্তম। রিনিউ করার সময় ৳১০টাকা আর দিতে হবে না।

মাসিক টিকেট রিনিউ করাটা একটা ঝামেলা। কারণ আপনি যে টিকেট রিনিউ করতে দিয়েছেন, তার কোনো প্রমাণপত্র দেয়া হয় না। আপনার টিকেটখানা হাতছাড়া করলেন, আবার আপনাকে ট্রেনে ভ্রমণ করতেও হবে, পুরো ব্যাপারটাই একটা ভজকট, রীতিমতো পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হয় পলাতক আসামীর মতো। তাছাড়া রিনিউ করার জন্য আপনার টিকেট জমা দেবার এক থেকে দেড়দিন কিংবা দুদিন পর নতুন টিকেট দেয়া হয়। এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেন একজন, এবং তিনি কাজে ব্যস্ত থাকলে, কিংবা খামখেয়ালি করলে সময়টা আরো দীর্ঘও হতে পারে। …এখানে প্রশ্ন থাকতে পারে, কেন তাহলে ঐ ক’দিন যাত্রী-টিকেট কেটে ট্রেনে ওঠেন না এরা? (মাসিক টিকেট করতে আগ্রহীদের দৃষ্টি অবশ্যই পরিশিষ্ট ২-এ আকর্ষণ করছি)

যাত্রী টিকেট কি আর সাধে কাটে না মানুষ? –সে এক মহাগ্যাঞ্জামের কাহিনী। পরের পর্বের জন্য থাক। আরো বাকি থাকলো, হরতালের দিন কী বিশেষ জিনিস উড়ে উড়ে আসে ট্রেনে, আর রেলওয়ের এক-গাদা রহস্য। পরের পর্বগুলো লেখার অপেক্ষায়…

-মঈনুল ইসলাম

______________________________

পরিশিষ্ট ১ (সাম্প্রতিকীকরণের তারিখ: অক্টোবর ৩০, ২০১৩):

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলের মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব নেয়ার পর একটা দারুণ কাজ হয়েছে: মাসিক টিকেট এখন হাতে-হাতে পাওয়া যায়। ১৭ নম্বর টিকেট কাউন্টার থেকে মাসের ৫ তারিখের মধ্যে যেকোনো অফিস সময়ে নতুন মাসিক টিকেট সংগ্রহ ও পুরোন মাসিক টিকেট নবায়ন করা যায়। লাইনে দাঁড়িয়ে হাতে-হাতে সরাসরি টাকা দিয়ে টিকেট সংগ্রহ করা যায়। তবে নতুন টিকেটের জন্য দরখাস্তের বিষয়টি বরাবরের মতোই আছে বলে জানা যায়। ধন্যবাদ প্রাক্তন এই রেলমন্ত্রীকে।

পরিশিষ্ট ২ (সাম্প্রতিকীকরণের তারিখ: মার্চ ৪, ২০১৪):

রেলের টিকেটের দাম বাড়ানোর প্রাক্কালে মাসিক টিকেটের ৳৩০০ [টাকার] টিকেটটি হয়ে গেছে ৳৪৫০ [টাকা], আর ৳১০০০ [টাকার] টিকেটটি এখন আর নেই। কাউন্টারের নম্বরটা আপেক্ষিক, বর্তমানে ১৩ নম্বর কাউন্টার থেকে মাসিক টিকেট দেয়া হয়। আর নতুন টিকেট নিতে হলে ছবিও আর দুই কপি লাগে না, লাগে এক কপি, আর কোনো দরখাস্তও করা লাগে না। তবে নতুন টিকেট নেবার সময় প্রথমবার অতিরিক্ত ৳১০ [টাকার] বিষয়টি অপরিবর্তনীয় আছে। বর্তমানে একটা ছোট্ট সমস্যা হলো: মাসের যে তারিখে টিকেট নিচ্ছেন, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখটাও দেয়া হয় পরবর্তি মাসের সেই তারিখে। এতে একটা সমস্যা: যদি মাসের ১ তারিখে নেন, পরবর্তি মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত ভ্যালিড হওয়াসত্ত্বেয় আপনি কিন্তু ২ তারিখ ইনভ্যালিড হয়ে যাবেন। বিষয়টা নিয়ে কাউন্টারে একটু আলাপ করতে হবে, মনে হচ্ছে। কিন্তু যার সাথে আলাপ করবো, সে তো মহাব্যস্ত! 🙁

মন্তব্য করুন